সোমবার, ৪ জুলাই ২০১১, ২০ আষাঢ় ১৪১৮, ১ শাবান ১৪৩২

শেখ হাসিনাকে চারবার হত্যার চেষ্টা চালায় হরকাতুল জিহাদ

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগে আরও অন্তত তিনবার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)।
শেখ হাসিনাকে হত্যার প্রথম চেষ্টা হয়েছিল ২০০০ সালে। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ওই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০০১ সালে খুলনায়, একই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিলেটে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালায় এই জঙ্গিগোষ্ঠী।
হুজির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা
(সংক্ষেপিত)

শেখ হাসিনা যে কারণে বেঁচে যান

শেখ হাসিনার সমাবেশ শুরু হওয়ার পর ১২ জন জঙ্গি তিন ভাগ হয়ে তাঁর মঞ্চের তিন দিকে অবস্থান নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলনেতা জান্দাল মঞ্চের সামনে প্রথম গ্রেনেডটি ছোড়েন। ধারণা ছিল, বিস্ফোরণের পর মঞ্চের সামনের জায়গা ফাঁকা হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া জঙ্গি বুলবুল গিয়ে সরাসরি মঞ্চে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড ছুড়বেন। কিন্তু প্রথম গ্রেনেডটি বিস্ফোরণের পর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা মানুষের ধাক্কায় পড়ে যান বুলবুল। উঠে আর গ্রেনেড ছোড়ার সুযোগ পাননি তিনি। এ কারণেই প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা, সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও।(সংক্ষেপিত)

জড়িতদের রক্ষায় বারবার সাজানো তদন্ত

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার নানা চেষ্টা চলে। এরই অংশ হিসেবে নোয়াখালীর গ্রাম থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে ধরে এনে সিআইডি সাজানো জবানবন্দি আদায় করে।জজ মিয়াকে দিয়ে বলানো সেই ‘আষাঢ়ে গল্প’ নিয়ে ২০০৫ সালের ২৯ জুন প্রথম আলোতে প্রকাশ করা হয় শিশির ভট্টাচার্য্যের আঁকা এই কার্টুন।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় শুরু থেকেই হোতাদের আড়াল করতে তদন্তের গতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তদন্তের নামে বিভিন্ন সময় নানা ‘আষাঢ়ে গল্প’ হাজির করে প্রথম থেকেই বিষয়টিকে বিতর্কিত করার কাজ শুরু হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ একটি মহলের প্রভাব কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট হামলার দিনই পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করে। প্রথমে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি)। কয়েক দিন পর মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডিতে স্থানান্তরিত হয়।
ক্ষমতায় থাকা বিএনপি ঘটনার গুরুত্বকে নষ্ট করতে হামলার শিকার আওয়ামী লীগের দিকেই সন্দেহের আঙুল তোলে। জোট সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নেতা তাঁদের বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ নিজেরাই জড়িত বলে প্রচার চালান। হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত বলেও তখন একটা মহল থেকে প্রচার চালানো হয়।
পার্থকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন: শেখ হাসিনাকে ই-মেইলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ২০০৫ সালের ২৫ আগস্ট শৈবাল সাহা পার্থ নামের এক যুবককে ধরে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পার্থ যেহেতু ভারতে লেখাপড়া করেছেন, তাই তাঁকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার চর হিসেবে প্রমাণের জন্যও তখন অসামরিক একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে প্রচার চালানো হয়। 

হাইকোর্টের নির্দেশে জামিন পেয়ে সাত মাস পর কারাগার থেকে মুক্তি পান পার্থ। পার্থ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে টানা পাঁচ দিন চোখ বেঁধে ব্যাপক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ধানমন্ডি থানায় সোপর্দ করা হয়।
জানা গেছে, ওই পাঁচ দিন পার্থ গোয়েন্দা সংস্থার হেফাজতে ছিলেন। ২১ আগস্ট মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টায় ওই সংস্থার তখনকার শীর্ষ কর্তারাও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
মগবাজারের আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার: ঢাকার মগবাজার এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা মোখলেছুর রহমানকেও এই মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। তাঁকে দুই দফা রিমান্ডেও নেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, সিআইডি তাঁকে গ্রেনেড হামলায় জড়াতে না পেরে সাক্ষী হওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল।
জজ মিয়া উপাখ্যান: কিছুদিন পর দৃশ্যপটে হাজির করা হয় ‘জজ মিয়া উপাখ্যান’। ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বীরকোট গ্রামের বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে সিআইডি আটক করে। ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে জজ মিয়ার কাছ থেকে সিআইডি সাজানো জবানবন্দি আদায় করে।
এই জজ মিয়াকে দিয়েই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে তদন্তের নামে ‘আষাঢ়ে গল্প’ প্রচার করেছিলেন মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদ ও তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন।
সিআইডির এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনিও এই সাজানো ছকে কথিত তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যান। এই গল্প সাজানোর ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া সেই সাজানো জবানবন্দিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, তিনি আগে কখনো গ্রেনেড দেখেননি; গ্রেনেড ও বোমার মধ্যে পার্থক্য তিনি জানেন না। পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় ভাইদের নির্দেশে তিনি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নেন। আর বড় ভাইয়েরা হচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ, মুকুল প্রমুখ। এই সাজানো গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। উল্লিখিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগ জোট সরকারের সময় ভারতে পালিয়ে যায়।
এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন। তিনি প্রথম আলোকে সাক্ষাৎকারে বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকে সিআইডি তাঁর পরিবারকে মাসে মাসে ভরণ-পোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি। (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ আগস্ট ২০০৬ )  ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে এই মামলার তদন্তের উদ্যোগ নেয়। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন এ-সংক্রান্ত মামলা দুটির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন। এতে হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি হান্নান ও জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জোট সরকারের আমলে গ্রেপ্তার করা জজ মিয়া, পার্থসহ ২০ জনের অব্যাহতি দেওয়া হয়।
মামলা ভিন্ন খাতে নেন তিন সিআইডি কর্মকর্তা: জোট সরকারের আমলে মামলাটি মোট পাঁচজন কর্মকর্তা তদন্ত করেন। শুরুতে মতিঝিল থানার দারোগা আমির হোসেন ও ডিবির ইন্সপেক্টর শামসুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। সিআইডিতে স্থানান্তরের পর প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এএসপি আবদুর রশিদ, পরে তদন্ত করেন এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান।
সূত্র জানায়, মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিনের তত্ত্বাবধানে আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিক এ মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেন। তাঁরা মূল হোতাদের আড়াল করতে জজ মিয়ার গল্প ফাঁদেন। ওই সময় তাঁরা মোট ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেন।
অতীতে মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সঙ্গে জড়িত সাবেক এই তিন তদন্ত কর্মকর্তাকে সম্পুরক অভিযোগপত্রে আসামী করা হয়েছে। এই তিন কর্মকর্তাই এখন অবসর আছেন।
(সংক্ষেপিত) 

 

৬ জুলাই সকাল থেকে বিএনপি ও জামায়াতের ৪৮ ঘণ্টার হরতাল

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে সারা দেশে ৬ ও ৭ জুলাই (বুধ ও বৃহস্পতিবার) ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। দল দুটির ঘোষণা অনুযায়ী, বুধবার সকাল ছয়টা থেকে শুরু হয়ে শুক্রবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত এই হরতাল কর্মসূচি চলবে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অন্যান্য শরিক বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) এবং খেলাফত মজলিসও একই কর্মসূচি দিয়েছে। এ কারণে বুধবার থেকে আগামী সোমবার পর্যন্ত টানা ছয় দিন হরতাল আর ছুটির ফাঁদে পড়ছে দেশ। কারণ ৪৮ ঘণ্টার হরতালের পর শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। আগামী রবি ও সোমবার টানা ৩০ ঘণ্টা দেশব্যাপী হরতালের কর্মসূচি এর আগেই ঘোষণা করেছে ধর্মভিত্তিক ও সমমনা ১২টি সংগঠন।
চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী গতকাল রোববার দুপুর সোয়া ১২টায় সংবাদ সম্মেলনে এই হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর এক ঘণ্টা পর বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে একই কর্মসূচি দেয়।
(সংক্ষেপিত)